
বরিশালে ভুয়া নারী সেনা ক্যাপ্টেনের প্রতারণার জাল: চাকরি নামে অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাৎ
নিজস্ব প্রতিবেদক,বরিশাল:
সেনাবাহিনীর মেসে ও সিএমএইচ হাসপাতালে আয়া,বুয়া ও বাবুর্চিসহ বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক নারী ও তার চক্রের বিরুদ্ধে। নিজেকে লেবুখালী সেনানিবাসের ‘মেডিকেল ক্যাপ্টেন’ পরিচয়ে আস্থা অর্জন,ভুয়া আইডি কার্ড প্রদর্শন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে এই প্রতারণা চালানো হয়।
এই ঘটনায় প্রতারণার শিকার দুই নারী আদালতের শরণাপন্ন হয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নম্বর: সিআর-১৩৬৯/২০২৬ এবং সিআর-১৩৭০/২০২৬, কোতোয়ালি)। গত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে মামলা দুটি রুজু করে কোতোয়ালি থানার ওসিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অভিযোগের তীর বরিশাল নগরীর রূপাতলী এলাকার মাসুম ভিলার বাসিন্দা নুসরাত জান্নাত লাবনীর দিকে। বাকেরগঞ্জের দুধল গ্রামের নাসির উদ্দিনের মেয়ে লাবনী মূলত এক সরকারি সৈনিকের স্ত্রী। অনুসন্ধানে জানা গেছে,এ পর্যন্ত তার অন্তত ছয়টি বিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে (যার মধ্যে ৩ জন সৈনিক ও ১ জন বিজিবি সদস্য)। বর্তমানে আগের স্বামীদের ডিভোর্স দিয়ে কাবিনের মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে হামিম নামের এক সৈনিকের সংসার করছেন তিনি। টিকটক আইডির মাধ্যমে অবিবাহিত সেজে সৈনিক ও যুবকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করাই তার মূল কৌশল।
মর্জিনা,বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা,মিনু, বর্তমানে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে আয়া হিসেবে কর্মরত।আপেল ও তার স্ত্রী মনিকা,রাজশাহী থেকে আসা আপেল বরিশাল ক্যান্সার হাসপাতালে ফোরম্যান হিসেবে কর্মরত।সোহেল চান মারি এলাকার মাদক ব্যবসায়ী এবং দালাল।
চক্রটি রূপাতলী এলাকার জুলেখা বেগমের কাছ থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং সালমা নামের এক নারীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকাসহ প্রায় দুই ডজন (২১ জন) নারী-পুরুষের কাছ থেকে অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা নেওয়ার পর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে লাবনী ভুক্তভোগীদের নামে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে বলেন,আগামী মাস থেকে এখানেই বেতন জমা হবে। কাউকে আবার মাস্টাররোলে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়।
প্রতারণা আড়াল করতে লাবনী অভিনব সব নাটক সাজাতেন। ভুয়া প্রশিক্ষণ ভ্রমণ ১০-১২ জন নারীকে চাকরির ভাইভা দেওয়ার কথা বলে ঢাকা,গুলিস্তানের হোটেল,গোপালগঞ্জ,বাগেরহাটের খান জাহান আলী মাজার এবং কুয়াকাটায় ঘুরিয়ে এনে সময় ক্ষেপণ করা হয়।
বাইরে থেকে রেশনের মালামাল কিনে ভুক্তভোগীদের বাসায় পাঠানো এবং চাকরি নিশ্চিত হয়েছে বোঝাতে ২-১ মাসের বেতন বাবদ ৫-৭ হাজার টাকা দেওয়া হতো।
অনেক দিন ভোর ৬ টায় লেবুখালী ক্যান্টনমেন্ট থেকে গাড়ি আসার কথা বলে ১২-১৩ জন নারীকে নিজের বাসায় রাতযাপন করান,কিন্তু পরবর্তীতে কোনো গাড়ি আসেনি।
পাওনা টাকা কিংবা প্রমাণপত্র চাইলে ভুক্তভোগীদের উল্টো মামলার হুমকি দেওয়া হতো। ইতোমধ্যে এক ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছেন লাবনী।
ঘটনার অনুসন্ধানে গেলে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় অভিযুক্ত পক্ষ এবং উল্টো মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলার হুমকি দেয়। তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে নুসরাত জান্নাত লাবনী বলেন আমি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নিইনি। আমি নিজে চাকরি করি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
প্রথমে কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে কোনো সুরাহা না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা দায়ের করেন। ভুক্তভোগীদের কাছে চক্রটির অর্থ লেনদেন ও প্রতারণার একাধিক অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। এই সমস্ত প্রমাণাদি নিয়ে খুব শীঘ্রই সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কমান্ডিং অফিসারের (সিও) কাছে বিচার দাবি করতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নিঃস্ব হওয়া নারী ও পুরুষেরা।